বারবার জয়, তবু মন্ত্রিসভায় নয় — সরওয়ারকে ঘিরে প্রশ্ন
বারবার জয়, তবু মন্ত্রিসভায় নয় — সরওয়ারকে ঘিরে প্রশ্ন
রফিকুল ইসলাম | অতিথি প্রতিবেদক
বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ মজিবর রহমান সরওয়ার। উপনির্বাচন ও সাধারণ নির্বাচন মিলিয়ে বরিশাল–৫ (সিটি-সদর) আসনে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও এবারের মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বারবার জয় সত্ত্বেও কেন তিনি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হলেন না।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর যুগ্ম মহাসচিব সরওয়ার দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। দলের পুরনো ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে পরিচিত তিনি ১৯৯১, ১৯৯৮, ২০০১, ২০০৮ ও ২০২৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া দুটি উপনির্বাচনেও জয়ী হয়েছেন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংসদে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় হুইপ ছিলেন এবং জেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। যোগ্যতার বিচারে মন্ত্রী হওয়ার মতো ঘাটতি চোখে না পড়লেও বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
এবারের মন্ত্রিসভায় বরিশাল জেলা থেকে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন। একই সঙ্গে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই তিনজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। ভোলা থেকে নির্বাচিত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে এসব আলোচনায় সরওয়ারের নাম নেই।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হতে পারে এবং সেখানে নতুন মুখ যুক্ত হতে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য তালিকাতেও সরওয়ারের নাম নেই বলে জানা গেছে। ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে—দলীয় পদ, নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও ভোটার সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি উপেক্ষিত?
দলের ভেতরের সমীকরণ
বিএনপির নীতিনির্ধারণী স্তরে দীর্ঘদিন ধরে অলিখিত একটি সমীকরণ কাজ করে—কারা থাকবেন ফ্রন্টলাইনে, আর কারা সংগঠন সামলাবেন। দলীয় সূত্রের দাবি, সরওয়ারকে এই দুই তালিকার বাইরেই রাখা হয়েছে। সংসদে তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষমতার ভাগ বণ্টনের সময় তিনি “নিরাপদ পছন্দ”, কিন্তু “প্রাধান্যপ্রাপ্ত পছন্দ” নন।
দলের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না বলেও নেতাদের অনেকে মনে করেন। বরিশাল অঞ্চলে নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা তাকে কখনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চোখে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে—যা মন্ত্রিসভা গঠনের সময় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জনপ্রিয়তা বনাম কেন্দ্রীয় আস্থা
বরিশালে সরওয়ারের জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত হলেও জাতীয় রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা ও কেন্দ্রীয় আস্থা এক বিষয় নয়। এক সাবেক বিএনপি নেতা বলেন, ভোটে জয়ী হওয়া এক বিষয়, আর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া আরেক বিষয়; মন্ত্রিত্বের জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে নিঃশর্ত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমন্বয়ের প্রশ্নেই সরওয়ার বারবার পিছিয়ে পড়েছেন। সংসদে সক্রিয় থাকলেও তিনি কখনো দলের প্রচারযোগ্য মুখ হয়ে ওঠেননি।
মেয়র অধ্যায় কি প্রভাব ফেলেছে?
বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন সরওয়ারকে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী করেছে। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব ধরে রাখার বিষয়টি তাকে কেন্দ্রের চোখে অতিরিক্ত স্থানীয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা ও মিডিয়া উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তিনি তুলনামূলকভাবে নীরব ছিলেন। ইতিবাচক সংবাদ কম এবং নেতিবাচক সংবাদ বেশি প্রচারিত হওয়াও তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে বলে মত রয়েছে।
ক্ষমতার এক ধাপ দূরে
তিনবারের সংসদ সদস্য, দুইবার উপনির্বাচনে জয়, গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদ—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়া কেবল কাকতালীয় নয়; বরং দলীয় ক্ষমতার কাঠামো, আস্থা ও নিয়ন্ত্রণ রাজনীতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বরিশাল–৫ আসনের ভোটাররা তাকে পাঁচবার সংসদে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেই সংসদের ভেতরেই তিনি থেকে গেছেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এক ধাপ দূরে—এটাই তার রাজনৈতিক জীবনের বড় বৈপরীত্য।
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন জানান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে সরওয়ার ৫৫টি মামলার আসামি ছিলেন, চার বছরে ৯ বার গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় সাড়ে চার বছর কারাবরণ করেন। ২০১৪ সালের পর তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা হয়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়ে গেছে—ভোটে গ্রহণযোগ্য নেতা হয়েও কেন ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা মিলছে না সরওয়ারের?