মেয়াদ ফুরানোর আগেই ভাঙছে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি: মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আভাস
মেয়াদ ফুরানোর আগেই ভাঙছে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি: মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আভাস
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগেই ভেঙে দেওয়া হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি। একই সাথে দলটির মহাসচিবসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বড় ধরনের রদবদলের জোরালো আভাস পাওয়া গেছে।
দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখেই মূলত এই আগাম পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। আগামীকাল শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠেয় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম 'মজলিশে শুরা'র বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
নির্বাচনী মূল্যায়নে উঠে এল সাংগঠনিক ঘাটতি
দলীয় সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর গঠিত বর্তমান কমিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে সম্প্রতি শেষ হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার পর দলটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে কিছু সাংগঠনিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। এর মধ্যে প্রার্থী বাছাইয়ে ত্রুটি, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার অভাব এবং তৃণমূল কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে যাতে কোনো বিলম্ব না হয়, সেজন্যই ছয় মাস অপেক্ষা না করে দ্রুত নতুন নেতৃত্বকে মাঠে নামাতে চাইছে দলটি।
এই প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান জানান:
"সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনায় দলের ভেতর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। এখন আরও ছয় মাস অপেক্ষা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দেরি হয়ে যাবে। তাই মজলিশে শুরার বৈঠকে কমিটি পুনর্গঠনের এজেন্ডা তোলা হচ্ছে। সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে দলের আমির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।"
মহাসচিব পদে নতুন মুখের গুঞ্জন
দলটির ভেতরে সবচেয়ে বড় আলোচনা চলছে মহাসচিব পদ নিয়ে। ২০০৮ সাল থেকে টানা এই দায়িত্বে থাকা মাওলানা ইউনুছ আহমাদ এবার পদ হারাতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাকে দলের উপদেষ্টা পরিষদ বা প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হতে পারে।
নতুন মহাসচিব হিসেবে বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্য থেকেও কেউ এই পদে চলে আসতে পারেন। এছাড়া প্রেসিডিয়াম, উপদেষ্টা পরিষদ এবং সচিবালয় পর্যায়ে তরুণ ও নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের বড় মূল্যায়ন করা হতে পারে।
'চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী' থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হওয়ার লক্ষ্য
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এককভাবে লড়ে দলটি প্রায় ২২ লাখ ভোট (মোট ভোটের প্রায় ২.৭০ শতাংশ) পায় এবং একটি আসনে জয়লাভ করে। দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে থেকে এই ভোট প্রাপ্তিকে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে দলটি।
নেতারা বলছেন, এবারের পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং দলটিকে একটি দক্ষ নির্বাচনী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। তরুণ, নারী ও পেশাজীবীদের মাঝে দলের পরিধি বাড়াতে ইতিমধ্যেই ছাত্র ও যুব সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ এই বিষয়ে বলেন:
"আমাদের মূল লক্ষ্য নির্বাচনী রাজনীতিতে ভালো করা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে স্রেফ একটি প্রেশার গ্রুপ (চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী) থেকে সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী পলিটিক্যাল পার্টি (রাজনৈতিক দল) হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এই পুনর্গঠন তারই অংশ।"
শনিবার দুপুরে পুরানা পল্টনের একটি হোটেলে মজলিশে শুরার এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখান থেকে বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে নায়েবে আমির ও মহাসচিবসহ নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নাম ঘোষণা করা হতে পারে।