প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষেই সড়ক থেকে গায়েব ইট! বগুড়ায় চাঞ্চল্য
প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষেই সড়ক থেকে গায়েব ইট! বগুড়ায় চাঞ্চল্য
ভাড়া করা ইটে 'অস্থায়ী' রাস্তা, সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সুশাসনের জন্য প্রশাসনের
বগুড়া প্রতিনিধি | আজকের পয়গাম
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬
বগুড়া: প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে বিছানো হয়েছিল ইট। কিন্তু ভিভিআইপি সফর শেষ হতেই রাতারাতি সেই সড়ক থেকে উধাও হয়ে গেছে ইটের সোলিং! বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার একটি কাঁচা সড়কে ঘটে যাওয়া এমন এক অভিনব ঘটনা এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে এসে বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এরপর চৌকিরদহ খাল খননকাজ উদ্বোধন শেষে তিনি পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ী পরিদর্শনে যান। প্রধানমন্ত্রীর এই যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জিয়াবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার কাঁচা সড়কে রাতারাতি ইট ও বালু ফেলে চলাচলের উপযোগী করে তোলে। তবে সফর শেষ হওয়ার পরপরই সড়কটির ইটগুলো আবার তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থায়ী বরাদ্দ থাকতেও কেন 'ভাড়া'র নাটক?
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, এই ৫০০ মিটার সড়ক পাকাকরণের জন্য আগেই ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্পেটিংয়ের কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছিল।
তাহলে কেন এই অস্থায়ী আয়োজন? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি— সড়কটির স্থায়ী উন্নয়ন প্রকল্প আগে থেকেই অনুমোদিত ছিল। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াত সচল করতে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ না করে, সাময়িকভাবে ১০ লাখ টাকায় ইট ভাড়া নিয়ে বিছানো হয়েছিল। সফর শেষে মূল প্রকল্পের কাজের স্বার্থেই সেই ইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অস্থায়ী সোলিংয়ের দায়িত্বে থাকা আতিকুর রহমান বলেন,
"এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী ভাটা থেকে ইট এনে সড়কে বিছানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সেই ইট আবার ভাটায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয় ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অপচয় হয়নি।"
বগুড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামানও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ইটগুলো কেনা হয়নি, বরং ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হয়েছে এবং স্থায়ী নির্মাণকাজে কোনো বাধা থাকছে না। অন্যদিকে গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান জানান, সীমানাসংক্রান্ত জটিলতায় কাজ শুরু হতে দেরি হলেও বর্তমানে মূল সড়ক টেকসই করার প্রস্তুতি চলছে।
"চরম ছলচাতুরী ও অর্থ অপচয়"
এদিকে সরকারি টাকায় ইট ভাড়া করে এভাবে অস্থায়ী সড়ক নির্মাণ ও তা ভেঙে ফেলার বিষয়টিকে আইনি ও নৈতিকভাবে দেখছেন না সচেতন নাগরিকরা।
বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক। তিনি ‘আজকের পয়গাম’-কে বলেন:
"একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছিয়ে, তিনি চলে যাওয়ার পর তা তুলে নেওয়া চরম ছলচাতুরী। এই কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হোক না কেন, তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।"
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই সড়কটির স্থায়ী সুফলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন বাগবাড়ী ও জিয়াবাড়ী এলাকার মানুষ। সাময়িক এই "ইট-উধাও" নাটকের সমালোচনা করলেও, এলাকাবাসীর দাবি— এবার যেন কোনো টালবাহানা না করে দ্রুত কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করা হয়। সড়কটি স্থায়ীভাবে নির্মিত হলে স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং অর্থনৈতিক চিত্রে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।