যাকাত ও সাদকায়ে ফিতর: ফাযায়েল, মাসায়েল ও কওমি মাদ্রাসায় প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরলেন মুফতি ছাইদ আহমদ
যাকাত ও সাদকায়ে ফিতর: ফাযায়েল, মাসায়েল ও কওমি মাদ্রাসায় প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরলেন মুফতি ছাইদ আহমদ
বরিশাল প্রতিনিধি:
যাকাত ও সাদকায়ে ফিতর ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। এগুলোর সঠিক বিধান জানা ও যথাযথভাবে আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরেছেন বরিশালের হরিনাফুলিয়া জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব মুফতি ছাইদ আহমদ।
তিনি বলেন, যাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ”
“নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো।”
সূরা আল-বাকারা: ৪৩
তিনি আরও বলেন, যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র ও বরকতময় হয়, গুনাহ মাফের কারণ সৃষ্টি হয় এবং সমাজে দারিদ্র্য বিমোচন ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
“مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ”
“সদকা দিলে সম্পদ কমে না।”
সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮
রেফারেন্স
সহীহ বুখারী, হাদিস ১৩৯৫
তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫
যাকাতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
মুফতি ছাইদ আহমদ বলেন, যাকাতের শাব্দিক অর্থ হলো পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও বরকত।
পারিভাষিক অর্থ হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর পূর্ণ এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হলে নির্ধারিত অংশ নির্দিষ্ট হকদারের নিকট মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রদান করা।
রেফারেন্স
আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০০
ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭০
যাকাত কার উপর ফরজ
তিনি বলেন, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ হলে যাকাত ফরজ হয়
১. মুসলিম হওয়া
২. বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া
৪. ঐ সম্পদের উপর পূর্ণ এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়া
নিসাবের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি বলেন
সোনা ৭.৫ ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম)
রূপা ৫২.৫ ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম)
অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক সম্পদ।
রেফারেন্স
দুররে মুখতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৮
রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৬
গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল
তিনি বলেন
পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব হিসাব করতে হবে।
বসবাসের ঘর, ব্যবহৃত পোশাক ও প্রয়োজনীয় আসবাবে যাকাত নেই।
হানাফি মতে ব্যবহৃত স্বর্ণালংকারেও যাকাত ফরজ।
ব্যবসায়িক পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্যে যাকাত হিসাব করতে হবে।
রেফারেন্স
ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৮
সাদকায়ে ফিতর
সাদকায়ে ফিতর সম্পর্কে তিনি বলেন, ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার উপর সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন
“فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ”
“রাসূলুল্লাহ ﷺ সাদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারের পবিত্রতার জন্য।”
আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯
রেফারেন্স
ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯২
কওমি মাদ্রাসায় যাকাত প্রদানের গুরুত্ব
মুফতি ছাইদ আহমদ বলেন, দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে অসংখ্য গরিব, মিসকিন ও এতিম শিক্ষার্থী দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করছে। তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও কিতাবের ব্যয় বহনে যাকাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী যাকাতের হকদার শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে যাকাত প্রদান করলে দ্বীনি শিক্ষা সংরক্ষণ ও আলেম তৈরির কাজে সহায়তা করা যায় এবং এটি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হয়।
রেফারেন্স
দুররে মুখতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫৩
ফাতাওয়া শামি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৪
যাকাতের প্রাপ্য হকদার (৮ শ্রেণী)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন
“إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ…”
“নিশ্চয় যাকাত হলো ফকির, মিসকিন, আমিল, মুআল্লাফাতুল কুলুব, রিকাব, গারিমিন, ফি সাবিলিল্লাহ ও ইবনুস সাবিলের জন্য।”
সূরা তাওবা: ৬০
উপসংহার
তিনি বলেন, যাকাত ও সাদকায়ে ফিতর মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়ের অন্যতম মাধ্যম। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত সঠিক মাসায়েল জেনে বিশুদ্ধ নিয়তে এই ইবাদত আদায় করা।
বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার গরিব শিক্ষার্থীদের মাঝে যাকাত প্রদান করলে ইলমে দ্বীনের খেদমতে শরিক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।
সংকলনে
মুফতি ছাইদ আহমদ
সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব
হরিনাফুলিয়া জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল।