মহাকাশে আধিপত্যের নতুন লড়াই: চাঁদে স্থায়ী আবাস গড়ার ঘোষণা নাসার
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু স্বল্প সময়ের ভ্রমণ নয়, বরং চাঁদের মাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উপযোগী ঘাঁটি নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। ‘ইগনিশন’ নামক এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন থেকে নিয়মিত চন্দ্রাভিযানের পাশাপাশি মহাকাশের আরও গভীরে পৌঁছানোর জন্য চাঁদকে একটি ‘লঞ্চিং প্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
ট্রাম্পের মহাকাশ নীতি ও নাসার নতুন লক্ষ্য
এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির প্রতিফলন। নাসার বর্তমান প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাঁদে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান তারা। তাঁর মতে, মহাকাশ জয়ের এই প্রতিযোগিতায় এখন সাফল্যের হিসাব হবে বছরের বদলে মাসের ভিত্তিতে।
২০২৭: আর্টেমিস-৩ ও নিয়মিত মিশন
নাসার এই নতুন কৌশলে অভিযানের ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বড় কোনো একক মিশনের বদলে এখন থেকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ঘন ঘন অভিযান এবং ‘রি-ইউজেবল’ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং প্রযুক্তির ওপর।
২০২৭ সাল: আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে আবারও চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন নভোচারীরা।
ছয় মাসের বিরতি: প্রথম সফল অবতরণের পর প্রতি ছয় মাস অন্তর নিয়মিতভাবে মানব মিশন পাঠানো হবে।
লক্ষ্যস্থল: মূলত চাঁদের দক্ষিণ মেরু এবং কৌশলগত এলাকাগুলোতে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।
বাস্তবায়নের তিন ধাপ
নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল প্রকল্প তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হবে:
১. প্রথম ধাপ: কঠোর প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি রোবোটিক ও কার্গো মিশনের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো হবে। ২. দ্বিতীয় ধাপ: চাঁদের বুকে প্রাথমিক অবকাঠামো ও আধা-বাসযোগ্য ঘর নির্মাণ করা হবে, যাতে নভোচারীদের যাতায়াত ও অবস্থান সহজ হয়। ৩. চূড়ান্ত ধাপ: আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় একে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই ঘাঁটিটিই ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহসহ গভীর মহাকাশ অভিযানের ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে কাজ করবে।
বেসরকারি খাত ও বিশ্ব রাজনীতি
খরচ কমাতে এবং দ্রুত লক্ষ্য অর্জনে ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স বা ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে নাসা। এই তৎপরতার পেছনে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাবও স্পষ্ট। চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোও চাঁদে নিজেদের ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে মহাকাশে নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই মরিয়া।
যদি নাসার এই ‘ইগনিশন’ পরিকল্পনা সফল হয়, তবে মানব সভ্যতা পৃথিবীর বাইরে তার প্রথম স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পাবে।